ভালো ট্রাইকো কম্পোস্ট চিনবেন কীভাবে: কেনার আগে যা দেখবেন
প্রকাশ: ২০২৬-১১-০৪ · হালনাগাদ: ২০২৬-১১-০৪
লিখেছেন: মীর ইশতিয়াক (Meer Estiyak), সহপ্রতিষ্ঠাতা, খামারভেস্ট
অনলাইনে বা নার্সারির দোকানে কম্পোস্ট কিনতে গিয়ে মনে প্রশ্ন আসে: এটা কি সত্যিই পাকা কম্পোস্ট, নাকি কাঁচা, ভেজা আর গন্ধওয়ালা? এই লেখায় এমন কিছু পরীক্ষা আছে, যা দোকানে দাঁড়িয়ে বা ঘরে এসে নিজেই করা যায়। একটা কথা আগেই বলে নিই: এগুলো কম্পোস্ট পাকা কি না আর মান কেমন, তা বোঝার উপায়। ট্রাইকোডার্মা কতটা আছে, তা দেখে বা ছুঁয়ে বোঝা যায় না, তার জন্য পরীক্ষাগার লাগে। তথ্য নেওয়া হয়েছে কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া কৃষি মন্ত্রণালয়, FAO আর বাংলাদেশের গবেষণা থেকে, সূত্র শেষে।
এক নজরে: দোকানে দাঁড়িয়ে যা করবেন
- শুঁকে দেখুন। মাটির সোঁদা গন্ধ ভালো। ঝাঁঝালো অ্যামোনিয়া, টক, পচা বা ভিনেগারের গন্ধ মানে কম্পোস্ট এখনো কাঁচা।
- হাত ঢুকিয়ে দেখুন। গরম লাগলে ভেতরে এখনো পচন চলছে।
- রং আর দানা দেখুন। গাঢ় বাদামি থেকে কালো, ঝুরঝুরে, চেনা যায় এমন কাঁচামাল নেই।
- চেপে দেখুন। মুঠোয় চাপলে পানি গড়ানো বা কাদা কাদা ভাব থাকবে না।
- প্যাকেটের তথ্য চান। বিক্রেতার নাম ও যোগাযোগ, ওজন, উপাদান আর তৈরির তারিখ। ঘরে এসে অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা করুন।
১. ট্রাইকো কম্পোস্ট আসলে কী
ট্রাইকোডার্মা মাটিতে থাকা এক ধরনের ছত্রাক। কম্পোস্ট বানানোর সময় যে অণুজীব মেশানো হয়, তার মধ্যে ট্রাইকোডার্মার মতো ছত্রাকের কথা FAO-র পুস্তিকায় আছে (সূত্র ২)।
বাংলাদেশের একটি গবেষণায় ট্রাইকো কম্পোস্ট বানানো হয়েছে ট্রাইকোডার্মা হারজিয়ানামের স্পোর-দ্রবণ প্রক্রিয়াজাত গোবর, মুরগির বিষ্ঠা, কচুরিপানা, সবজির বর্জ্য, কাঠের গুঁড়ো, ভুট্টার ভুসি আর চিটাগুড়ের সঙ্গে মিশিয়ে, স্তরে স্তরে সাজিয়ে (সূত্র ৩)। মানে ট্রাইকো কম্পোস্টের উপাদান আর পদ্ধতি সবার একরকম নয়। তাই কেনার সময় উপাদান জেনে নেওয়াই ভালো। ট্রাইকো কম্পোস্ট কী আর কীভাবে ব্যবহার করবেন, তা এই গাইডে আছে।
২. গরম হওয়া কেন ভালো, আর ট্রাইকোডার্মা কখন মেশানো হয়
ভালো কম্পোস্ট বানানোর সময় স্তূপ নিজে থেকেই গরম হয়ে ওঠে। FAO-র পুস্তিকা অনুযায়ী প্রথম কয়েক দিনেই তাপ ৭০-৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠতে পারে, আর এই চূড়ান্ত গরম অবস্থাই রোগজীবাণু আর আগাছার বীজ মেরে ফেলে। রোগজীবাণু সাধারণত ৫৫ ডিগ্রি আর তার ওপরে মরে, আর আগাছার বীজের ক্ষেত্রে ক্রান্তিক বিন্দু ৬২ ডিগ্রি (সূত্র ২)। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ফ্যাক্টশিটে বলা আছে, ৫৫-৬৫ ডিগ্রিতে অন্তত টানা ৩ দিন থাকা দরকার। এতটা গরম না হলে রোগ আর আগাছার বীজ আপনার টবে চলে আসতে পারে (সূত্র ১)।
ট্রাইকোডার্মার ব্যাপারটা আলাদা। এটি জীবন্ত ছত্রাক। একটি গবেষণায় ট্রাইকোডার্মা হারজিয়ানামের একটি আইসোলেট ১৫-৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ভালো বেড়েছে, আর সর্বোচ্চ সহনশীলতা ছিল ৩৭ ডিগ্রি (সূত্র ৪)। ৫৫-৬৫ ডিগ্রির গরমের তুলনায় এটা অনেক কম। তাই ছত্রাকের স্পোর ঠান্ডা অবস্থায় মেশানোই যুক্তিসংগত, এটা সূত্র ২ আর ৪ মিলিয়ে আমাদের ব্যাখ্যা। কোন ধাপে মেশানো হয়, তা পদ্ধতিভেদে আলাদা হতে পারে, তাই বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।
কম্পোস্ট পাকা হয়ে এলে তাপ আবার আশপাশের তাপমাত্রায় নেমে আসে (সূত্র ২)। নিচের পরীক্ষাগুলো সেই “পাকা হওয়া”-ই ধরার চেষ্টা।
৩. চোখে দেখে
- রং: গাঢ় বাদামি থেকে কালো (সূত্র ২)।
- দানা: কণাগুলো ছোট আর মাটির মতো একরকম হয়ে যায় (সূত্র ২)। আগের কাঁচামাল, যেমন খড়, পাতা বা কাঠের টুকরো, আলাদা করে চেনা যাওয়া উচিত নয় (সূত্র ৬)।
- বাইরের জিনিস: প্লাস্টিক, কাচ বা ধাতুর টুকরো থাকলে কম্পোস্টের মান কমে। বড় বড় মোটা টুকরো টবের মাটিতে শিকড়ের জায়গা নষ্ট করে আর চারা গজাতে বাধা দেয় (সূত্র ১)।
একটি সাবধানবাণী: শুধু রং আর চেহারা দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না। ইলিনয় এক্সটেনশন বলছে, দেখতে তৈরি মনে হলেও কম্পোস্ট থেকে তখনো অ্যামোনিয়া বেরোতে পারে (সূত্র ৬)। তাই গন্ধ আর তাপ দুটোও দেখুন।
৪. গন্ধে আর হাতে
গন্ধ। পাকা কম্পোস্টের গন্ধ নিরপেক্ষ, মাটির সোঁদা গন্ধের মতো। কাঁচা কম্পোস্টে অ্যামোনিয়ার মতো ঝাঁঝ, টক বা পচা গন্ধ থাকতে পারে (সূত্র ১)। ভিনেগারের মতো গন্ধ থাকলে বুঝবেন বাতাসের অভাবে তৈরি হওয়া অ্যাসিড জমে আছে, যা গাছের শিকড়ের জন্য ক্ষতিকর (সূত্র ১)।
ব্যাগ পরীক্ষা। একটু কম্পোস্ট জারে বা চেপে বন্ধ করা ব্যাগে ২-৩ দিন রেখে খুলে শুঁকুন। খারাপ গন্ধ পেলে কম্পোস্ট এখনো প্রস্তুত নয় (সূত্র ১)। দোকানে নমুনা চেয়ে এটা ঘরে এসে করা যায়।
তাপ। পাকা কম্পোস্ট আশপাশের তাপমাত্রার সমান থাকে। নাড়লে গরম হয়ে উঠলে বা আশপাশের চেয়ে ৫ ডিগ্রির বেশি গরম হলে পচন শেষ হয়নি (সূত্র ১)। প্যাকেটে হাত ঢুকিয়ে ভেতরটা গরম লাগলে ওই একই কথা খাটে, এটা আমাদের ব্যবহারিক রূপ।
চেপে দেখা। মুঠোয় নিয়ে চাপুন। LSU AgCenter-এর কম্পোস্ট বানানোর পরীক্ষায় একটু ভেজা কিন্তু পানি বের হয় না, এমনটা আদর্শ। এক-দুই ফোঁটা পানি বেরোলে বেশি ভেজা, আর স্রোতের মতো পানি বেরোলে বা কাদার মতো হলে অনেক বেশি ভেজা (সূত্র ৫)। তবে FAO বলছে, তৈরি হওয়ার শেষে কম্পোস্টের আর্দ্রতা প্রায় ৩০ শতাংশে নামে (সূত্র ২)। তাই কেনা কম্পোস্ট হালকা ভেজা বা প্রায় শুকনো হওয়া অস্বাভাবিক নয়। পানি গড়ানোই আসল সতর্ক সংকেত।
৫. ঘরে বসে অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা
কাঁচা কম্পোস্টে থাকা অ্যাসিড, অ্যামোনিয়া আর লবণ বীজ গজাতে দেয় না, চারাও মেরে ফেলতে পারে (সূত্র ১)। তাই বীজ গজানোই কম্পোস্ট পাকা কি না, তার একটি ভালো পরীক্ষা।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ফ্যাক্টশিটের পদ্ধতি: ১০০টি দ্রুত গজানো বীজ (যেমন মুলা) ২.৫ সেন্টিমিটার ভেজা কম্পোস্টে, আর আরেক ট্রেতে ১০০টি বীজ জীবাণুমুক্ত পটিং মিক্সে লাগান। ৫-১০ দিন পর গুনুন। দুই ট্রেতে তুলনীয় সংখ্যক বীজ গজালে কম্পোস্ট যথেষ্ট পাকা (সূত্র ১)।
ঘরোয়া সরল রূপ (আমাদের হিসাব, আনুমানিক): দুটি কাপে একটিতে কম্পোস্ট, অন্যটিতে সাধারণ মাটি নিন। দুটিতেই একই রকমের ১০-২০টি বীজ দিন (যেকোনো দ্রুত গজানো বীজ চলবে, যেমন সরিষা, মেথি, মুলা বা লালশাক), হালকা পানি দিন, কয়েক দিন পর গজানো মিলিয়ে দেখুন। বিস্তারিত ধাপ আছে হোমপেজের এই অংশে।
কম্পোস্টের কাপে অনেক কম গজালে কম্পোস্ট কাঁচা। তখন ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার পরামর্শ: আরও ৪-৬ সপ্তাহ বাতাস আর হালকা ভেজা ভাব রেখে পাকতে দিন। জরুরি হলে মাটিতে না মিশিয়ে ওপরে ছড়ান, চারার গোড়া থেকে দূরে, আর বীজ বা কচি চারার মাটিতে ব্যবহার করবেন না (সূত্র ১)।
খামারভেস্ট ট্রাইকো কম্পোস্ট কিনলেও এই পরীক্ষাগুলো করে দেখুন, আর মন মতো না হলে আমাদের জানান।
৬. প্যাকেটে কী দেখবেন
বাংলাদেশে জৈব সারের মোড়কে কী কী লেখা বাধ্যতামূলক, তা আমরা যাচাই করতে পারিনি। তাই নিচেরটা একটি ব্যবহারিক তালিকা, কোনো আইনি শর্ত নয়:
- বিক্রেতার নাম ও যোগাযোগ। সমস্যা হলে কাকে জিজ্ঞেস করবেন।
- ওজন। প্যাকেটে যা লেখা, তা-ই পাচ্ছেন কি না।
- উপাদান। গোবর ছাড়া আর কী কী আছে। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ফ্যাক্টশিটে বলা আছে, কিছু কাঁচামাল থেকে ভারী ধাতু বা বাড়তি লবণ আসতে পারে, তাই কাঁচামাল জেনে নেওয়া উচিত (সূত্র ১)।
- তৈরির বা ব্যাচের তারিখ। ওই ফ্যাক্টশিট বলছে, কম্পোস্ট সাধারণত গরম পর্যায়ের পর অন্তত ১-২ মাস পাকতে দেওয়া হয়। বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করুন কতদিন পাকানো হয়েছে (সূত্র ১)।
- পরীক্ষার রিপোর্ট। ফ্যাক্টশিটে উৎপাদকের কাছে অঙ্কুরোদগম বা পরিপক্বতা পরীক্ষার ফল চাইতে বলা আছে (সূত্র ১)।
পুষ্টিমানের কোনো সংখ্যা লেখা থাকলে জিজ্ঞেস করুন সেটা কোন পরীক্ষাগারের রিপোর্ট। আমরাও রিপোর্ট না থাকা পর্যন্ত পুষ্টিমানের কোনো সংখ্যা লিখি না। ট্রাইকোডার্মার সংখ্যার ক্ষেত্রেও একই কথা: বাংলাদেশের গবেষণায় ট্রাইকো কম্পোস্ট থেকে ট্রাইকোডার্মাকে আলাদা করে চেনা হয়েছে পরীক্ষাগারে (সূত্র ৩), ঘরে বা দোকানে নয়।
৭. কোন লক্ষণ দেখলে কিনবেন না
- ঝাঁঝালো, টক, পচা বা ভিনেগারের গন্ধ। কম্পোস্ট কাঁচা, শিকড় পুড়তে পারে।
- হাতে গরম লাগা। পচন চলছে, মাটিতে মেশালে আরও চলবে।
- চেনা যায় এমন কাঁচামাল বা প্লাস্টিক, কাচ। পাকেনি, বা ঠিকমতো ঝাড়াই-বাছাই হয়নি।
- চেপে ধরলে পানি গড়ানো বা কাদার মতো ভাব। বাতাস না পেয়ে টক হয়ে যেতে পারে।
- বিক্রেতার নাম বা উপাদান বলতে না চাওয়া। সমস্যা হলে কাউকে খুঁজে পাবেন না।
- রোগ সারানো বা নিশ্চিত ফলনের দাবি। কোনো কম্পোস্ট সম্পর্কেই এমন প্রমাণ আমরা পাইনি। ভালো বিক্রেতা বলবেন কম্পোস্ট কী, আর কী নয়।
সাধারণ প্রশ্ন
তথ্যসূত্র
- British Columbia Ministry of Agriculture and Food (কানাডা), জুলাই ২০২৫: Assessing Compost, Agricultural Compost Factsheets. www2.gov.bc.ca/assets/gov/farming-natural-resources-and-industry/agriculture-and-seafood/agricultural-land-and-environment/waste-management/compost-management/assessing_compost_-_factsheet.pdf
- Misra, R. V., Roy, R. N. and Hiraoka, H. (2003). On-farm composting methods. FAO Land and Water Discussion Paper 2, অধ্যায় ১. http://www.fao.org/4/y5104e/y5104e05.htm
- Nahar, M. S. et al. (2012). Use of tricho-compost and tricho-leachate for management of soil-borne pathogens and production of healthy cabbage seedlings. Bangladesh J. Agril. Res. 37(4): 653-664. banglajol.info/index.php/BJAR/article/view/14390/10229
- McGee, C. F., Doyle, O. and Gaffney, M. T. (2020). Characterisation of Trichoderma isolates as agents for engineering disease suppressive composted growing media. Acta Horticulturae 1269. ishs.org/ishs-article/1269_1/
- LSU AgCenter (লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটি), Composting Series: Compost Moisture Content, Pub. 3838-C. www.lsuagcenter.com/articles/page1651158185675
- Illinois Extension (ইউনিভার্সিটি অফ ইলিনয়): Compost nutrient testing. extension.illinois.edu/soil-site/compost-nutrient-testing